তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্র ও শিল্পীদের নাম ঘোষণা করা হয় — কিন্তু ঘোষণাটি নিয়ে নানা নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ ও বিতর্ক উঠেছে।
সেরা ছবি ও সেরা পরিচালক খন্দকার সুমনের ‘সাঁতাও’— জুরিবোর্ড এই ছবিটিকে বছরের সেরা সিনেমা হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং একই নির্মাতা সেরা পরিচালকের পুরস্কারও পেয়েছেন। সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন আফরান নিশো (সুড়ঙ্গ), আর সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন আইনুন পুতুল (সাঁতাও)।
পার্শ্বচরিত্র (সেরা অভিনেতা) মনির আহমেদ শাকিল (সুড়ঙ্গ), পার্শ্বচরিত্র (সেরা অভিনেত্রী) নাজিয়া হক অর্শা (ওরা সাতজন)। সেরা খল অভিনেতা: আশীষ খন্দকার (অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন)। সেরা কৌতুক অভিনেতা: শহীদুজ্জামান সেলিম (সুড়ঙ্গ)।
শিশুশিল্পীর শাখায় লিয়ন ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার পান, একই সিনেমার আরিফ হাসান আনাইয়া খান শিশুশিল্পী বিশেষ শাখায় সম্মানিত হয়েছেন।
সঙ্গীত ও কণ্ঠের বিভাগে সেরা সংগীত পরিচালক হয়েছেন ইমন চৌধুরী (অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন)। সেরা গায়ক বালাম (ও প্রিয়তমা), সেরা গায়িকা অবন্তী দেব সিঁথি (সুড়ঙ্গ; গান: ‘গোটা পৃথিবীতে খুঁজো, এ গাঁ ছুঁয়ে বলো’)। সেরা গীতিকার সোমেস্বর অলি (গান: ‘ঈশ্বর’, সিনেমা: প্রিয়তমা) এবং একই গানের জন্য সেরা সুরকার হয়েছেন প্রিন্স মাহমুদ।
নৃত্য পরিচালক হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন হাবিবুর রহমান (লাল শাড়ি)। সেরা কাহিনিকার পুরস্কার পেয়েছেন ফারুক হোসেন (প্রিয়তমা)। সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে নাম এসেছে নিয়ামুল মুক্তা (রক্তজবা) — যদিও ‘রক্তজবা’-র মূল চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাসনীমুল হাসান তাজের নাম আলাদা উল্লেখ রয়েছে। সেরা গল্পকারদের তালিকায় রয়হান রাফী ও সৈয়দ নাজিম উদ দৌলা (সুড়ঙ্গ)।
সম্পাদনায় সেরা: সালাহ উদ্দিন আহমেদ বাবু (ওরা সাতজন)। শিল্পনির্দেশক: শহীদুল ইসলাম (সুড়ঙ্গ)। চিত্রগ্রাহক: সুমন কুমার সরকার (সুড়ঙ্গ)। পোশাক ও সাজসজ্জায় সেরা: বিথী আফরিন (সুড়ঙ্গ)। শব্দগ্রাহক: সুজন মাহমুদ (সাঁতাও)। মেকআপম্যান: সবুজ (প্রিয়তমা)।
স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগে সেরা সিনেমা: চৈতালী সমদ্দার নির্মিত ‘মরিয়ম’। প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে সেরা: এলিজা বিনতে এলাহী নির্মিত ‘লীলাবতি নাগ: দ্য রেবেল’।
তবু ঘোষণার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিস্তৃত মতামত ও সন্দেহ—বিশেষ করে পুরস্কার নীতিমালার কিছু নিয়মের ব্যত্যয়ের কারণে। নীতিমালায় বলা আছে, কোনো ছবিকে জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় আনতে হলে সেন্সর সনদ পেলে তা সিনেমা হলে বা সিনেপ্লেক্সে অন্তত এক শো প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু ‘রক্তজবা’ সেন্সর সনদ পাওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র ওটিটিতে মুক্তি পেয়েছিল; এ অবস্থায় কীভাবে তা জাতীয় পুরস্কারের তালিকায় জায়গা পেল, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও সমালোচক মনে করেন এলোপাথাড়ি ব্যতিক্রম ঘটিয়ে তিন নম্বর নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে।
আরেকটি বড় বিতর্ক জন্মেছে আজীবন সম্মাননা প্রদানে—নীতিমালায় মৃত ব্যক্তি সাধারণত পুরস্কারের জন্য বিবেচনার বাইরে থাকলেও এবার যৌথভাবে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক-নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চুকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে ইন্ডাস্ট্রি ও বোদ্ধামহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে—অনেকে প্রয়াত দু’জনের অবদান স্বীকার করে সম্মান জানালেও নীতিগত অনিয়ম হিসেবে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
কিছু ভোট ও নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নিয়েও অভিযোগ উঠেছে—উদাহরণস্বরূপ ‘ও প্রিয়তমা’ গানের কণ্ঠ দু’টি থাকলেও এককভাবে বালামকে জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে; অনেকে মনে করেন অন্য তুমুল জনপ্রিয় গান ‘ঈশ্বর’-এর নবাগত কণ্ঠশিল্পী রিয়াদর মতোদের মূল্যায়ন করা যেতে পারত। অন্যদিকে, দর্শকপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশোকে সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হওয়ায় অনেকেই তাকে অভিনন্দন জানালেও বাণিজ্যিক হিট ‘প্রিয়তমা’-র শাকিব খানকে অন্তর্ভুক্ত না করার পেছনে আভাস পেয়েছেন অনেকে—তারা মনে করেন শাকিবকেও বিবেচনায় নিলে বাণিজ্যিক ঘরানার অবদানকে সম্মাননা জানানো হত।
সংক্ষেপে, পুরস্কার তালিকিতে উল্লেখযোগ্য নাম ও গুণমান রয়েছে, কিন্তু ঘোষণার প্রক্রিয়া ও নীতিমালার ব্যতিক্রমগুলো এখন স্থিতাধিক আলোচনা এবং সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ও দর্শক উভয় পক্ষেই অনেকে যথাযথ ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছতা দাবি করছেন।
