দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে এক ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর হয়েছে, যা দুই পক্ষের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় তরঙ্গ লঘু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই চুক্তি ভারতের জন্য কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নতুন বাজার খোলার পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারিং ও সার্ভিস খাতে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াবে—এমনটাই মন্তব্য করেছেন নরেন্দ্র মোদী ও ইইউ শীর্ষ নেতারা।
চুক্তির মূল বিষয়: এই চুক্তির মাধ্যমে ২৭টি ইউরোপীয় দেশসহ ইইউ ও ভারত একটি বিস্তৃত মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার পথ সুগম হবে। যৌথভাবে এই অঞ্চলটি বিশ্ব জিডিপির প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং প্রায় দুইশ কোটির বেশি মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে, ফলে মালবাহী স্রোত ও বিনিয়োগে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুল্ক প্রণালী ও ব্যাসিক সুবিধা: স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে কয়েকটি বড় ক্লজ আছে—গাড়ির ওপর বিরাট শুল্ককাটের পরিকল্পনা অন্যতম; টেক্সট অনুসারে নির্দিষ্ট কোটার (বার্ষিক প্রায় ২.৫০ লক্ষ গাড়ি) মধ্যে গাড়ির আমদানি শুল্ক ধাপে ধাপে কমিয়ে ১১০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ করা হবে। রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং মহাকাশ প্রযুক্তির ওপরও শুল্ক ধাপে ধরে কমানো বা বাতিলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
কৃষক ও সংবেদনশীল খাত: ভারতের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষা করে দুগ্ধ ও চিনি শিল্পকে এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে স্থানীয় কৃষক ও চিনি উৎপাদনকে ক্ষতি না হয়—এটি চুক্তির এক উল্লেখযোগ্য উপাদান।
অর্থনৈতিক প্রভাব: ২০২৪-২৫ পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলারের ওপর ছিল; বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তি কার্যকর হলে এই লেনদেন কওরা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহশৃঙ্খল, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা দিতে পারে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: এই চুক্তি এমন সময়ে স্বাক্ষরিত হলো যখন বিশ্ব বাণিজ্যে চাপ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। গত কয়েক বছরে মার্কিন প্রশাসনের নীতিগুলো বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে—এই পটভূমিতেই ভারত ও ইইউ যৌথভাবে মুক্ত বাণিজ্যের উপরে জোর দিয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিল।
নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহযোগিতা: বাণিজ্যের বাইরে দুই পক্ষ প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠ হওয়ার তাগিদ রয়েছে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ও ইইউ প্রতিনিধি পেশাগত ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব অর্থাৎ সাপ্লাই চেইন একত্রিকরণ, সমুদ্রসীমা নিরাপত্তা ও সাইবার হুমকির মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
চুক্তির পথচলা: আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে, পরে ২০১৩ সালে তা স্থবির ছিল; নতুন রাউন্ডে ২০২২ সালের জুলাই থেকে আলোচনাকে ত্বরান্বিত করা হয় এবং গড়গড় করে চলা আলোচনার পর এটি চূড়ান্ত আকার পেয়েছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে এ চুক্তি কার্যকর হতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং কাউন্সিলের অনুমোদন বাধ্যতামূলক—সেই প্রক্রিয়া এখন অপেক্ষার মধ্যে।
সমাপনী মন্তব্য: দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় দুই পক্ষই আশাবাদী যে এটি ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং ও সার্ভিস খাতকে নতুন শক্তি দেবে এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ সহজ করবে। চুক্তির শর্তাবলীর বাস্তব প্রয়োগ ও রাজনীতিক প্রসঙ্গগুলোর সমাধান নির্দেশ করবে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল কেমন হবে।
