ব্লগার দৃষ্টি দে-র বিরুদ্ধে দেশব্যাপী দেয়াল লিখন অভিযান, ফাঁসি ও নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি – Daily Bhorer Potrika

ব্লগার দৃষ্টি দে-র বিরুদ্ধে দেশব্যাপী দেয়াল লিখন অভিযান, ফাঁসি ও নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৫

যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্লগার ও সমকামী অধিকার কর্মী দৃষ্টি দে-র বিরুদ্ধে সম্প্রতি সারাদেশে ব্যাপক দেয়াল লিখন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বড় শহরে তার গ্রেফতার, নাগরিকত্ব বাতিল এবং মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে তীব্র ভাষায় স্লোগান লেখা হয়েছে বিভিন্ন দেয়ালে। তবে এখনো এই দেয়াল লিখন অভিযানের পেছনে কোন ব্যক্তি বা সংগঠন জড়িত তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

গত সপ্তাহ থেকে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা, শাহবাগ, পুরান ঢাকা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও রংপুরসহ বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও গলির দেয়ালে এসব লেখা দেখা যাচ্ছে।

দেয়ালগুলোতে লেখা স্লোগানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: “দেশ ও ইসলামের শত্রু নাস্তিক সমকামী ব্যভিচারকারী ব্লগার দৃষ্টি দে-কে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি প্রদান করার জোর দাবি সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানের, আমাদের দাবি মানতে হবে, ফাঁসি দাও দিতে হবে।” 

অন্যান্য স্লোগানের মধ্যে রয়েছে: “সমকামী কুলাঙ্গার নাস্তিক ব্লগার দৃষ্টি দে-কে দ্রুত গ্রেফতার করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দাও দিতে হবে।”, “বাংলার মাটি হবে না নাস্তিকের ঘাঁটি। নাস্তিক সমকামী ব্লগার দৃষ্টি দে-র বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, ফাঁসি দাও দিতে হবে।”, “দেশ ও ইসলামের শত্রু নাস্তিক কুলাঙ্গার ব্লগার দৃষ্টি দে-কে অবিলম্বে গ্রেফতার করে ফাঁসি দাও।”

এছাড়াও কিছু দেয়ালে লেখা হয়েছে: “অধার্মিক ম্যাগাজিনের অন্যতম লেখিকা ইসলামের শত্রু, নাস্তিক কুলাঙ্গার সমকামী ব্লগার দৃষ্টি দে-কে অবিলম্বে গ্রেফতার করে তার নাগরিকত্ব বাতিল কর, করতে হবে।”, “ব্যভিচারকারী, সমকামী, আল্লাহর গজবপ্রাপ্ত নাস্তিক ব্লগার দৃষ্টি দে-কে অবিলম্বে গ্রেফতার করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন কর, করতে হবে।”

স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব দেয়াল লিখন মূলত গভীর রাতে করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, “গত কয়েকদিনে আমাদের এলাকায় অনেক দেয়ালে এরকম লেখা দেখছি। রাতের বেলা কারা লিখছে তা বোঝা যাচ্ছে না। সকালে উঠে দেখি নতুন নতুন লেখা যুক্ত হয়েছে।”

উত্তরা এলাকার একজন দোকান মালিক জানান, “এই লেখাগুলো দেখে আমরা বুঝতে পারছি কেউ একটা সংগঠিত অভিযান চালাচ্ছে। একই ধরনের লেখা বিভিন্ন এলাকায় একসাথে দেখা যাচ্ছে।”

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, দৃষ্টি দে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন এবং সেখান থেকে অনলাইনে সমকামী অধিকার, মানবাধিকার, নারীবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইসলামী মৌলবাদের সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশ করে আসছেন। তিনি ‘অধার্মিক’ ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লিখে থাকেন। তার লেখায় এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশে সমকামিতা বৈধকরণ, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার সমালোচনা এবং ইসলামী আইনের সংস্কারের মতো বিষয় স্থান পায়। এসব বিষয় বাংলাদেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।

হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে একাধিক ব্লগারের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা, নাস্তিক্যবাদ প্রচার এবং সমকামিতার পক্ষে প্রচারণার অভিযোগ এনে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছে।

এলাকার কয়েকজন ধর্মীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সমকামিতা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং যারা এর পক্ষে কথা বলেন তারা ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। তবে তারা দেয়াল লিখনের সাথে নিজেদের বা কোনো সংগঠনের যোগসূত্র অস্বীকার করেন।

মানবাধিকার কর্মীরা এই দেয়াল লিখনকে সহিংসতার প্ররোচনা এবং ব্যক্তির জীবনের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একজন কর্মকর্তা বলেন, “কাউকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া এবং সহিংসতার প্ররোচনা দেওয়া গুরুতর আইনি অপরাধ। কর্তৃপক্ষের উচিত এর বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং দায়ীদের খুঁজে বের করা।”

আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শামসুল হক বলেন, “বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া প্রকাশ্যে সহিংসতার প্ররোচনা দেওয়াও আইনত দণ্ডনীয়। এই দেয়াল লিখন স্পষ্টভাবে আইনের লঙ্ঘন এবং এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দেয়াল লিখনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ বিভাগ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই দেয়াল লিখনের ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এটিকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে অভিহিত করেছেন, আবার অনেকে ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামিতা নিষিদ্ধ এবং এর জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের দেয়াল লিখন দেশে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি হুমকির প্রতিফলন, যা মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।