যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে—এমন সতর্কতা উঠেছে আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র ও সংবাদমাধ্যমে। ব্রিটেনভিত্তিক মিডল ইস্ট আই’র এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সপ্তাহেই হামলা ঘটতে পারে, যদিও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সময়সূচি বদলাতে পারে।
প্রতিবেদনে যদিও সূত্রের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার পর ইরানের প্রতিশোধ ও এর আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু কর্মকর্তার মধ্যে উদ্বেগ আছে যে সরাসরি হামলা ইরানের আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে, আবার অন্যরা বলছেন সীমিত লক্ষ্যভিত্তিক হামলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ হিংসা ও বিক্ষোভ ও সেগুলোর প্রতি সরকারি কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগকে এক বিবেচ্য কারণ হিসেবে দেখছে। মিডল ইস্ট আই বলছে, গত এক মাস ধরে চলা বিক্ষোভ ও তার ওপর দমন-পীড়নে বহু নিহতের অভিযোগকে সামনে রেখেই মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা আক্রমণের সম্ভাবনা যাচাই করছেন।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত এক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এক পর্যায়ে উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; তখন সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক চাপের ভূমিকা ছিল বলে জানানো হয়েছে। তবে মিডল ইস্ট আই’র ভাষ্য ও পরে মন্তব্য থেকে দেখা যায়, সেই সময় সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করাটা স্থায়ী সিদ্ধান্ত ছিল না—কয়েকজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার মতে তা কেবল সাময়িক বিরতি মাত্র ছিল।
প্রতিবেদনে আরও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে ভেনেজুয়েলার বিষয়ে একই ধরনের কৌশল নেওয়ার কথাও আলোচিত ছিল। তবে বাস্তবে ভেনেজুয়েলায় এমন কোনো অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়নি—এমন ধরনের দাবি যাচাই করে দেখা গেছে বাস্তবে ঘটেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জানুয়ারির শুরুর দিকের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অনেক বেশি প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বিমান ও জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে এবং এই প্রস্তুতি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তারা মনে করেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড রয়রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অ্যাটরান্সিব বাহী রণতরী অ্যাব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে; এতে এফ-৩৫, এফ/এ-১৮ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন ধরণের প্ল্যান রয়েছে। সিসিএমড আরও জানায়, জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে এফ-১৫ স্কোয়াড্রন মোতায়েন করা হয়েছে—তবে এসব সম্পর্কে বিস্তারিত কৌশলগত তথ্য দেওয়া হয়নি।
একই সময়ে প্রতিবেদন সূত্রে বলা হয়েছে যে কিছু উপসাগরীয় দেশ নিজেদের আকাশসীমা বা ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সক্রিয় হামলার অনুমতি দেয়নি; ওই নিষেধাজ্ঞা এপ্রিল ২০২৫ থেকে কার্যকর রয়েছে বলে প্রচ্ছদে উল্লেখ আছে। রয়টার্সের খবরে একটি শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, আরব ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা হলে সেগুলোও পাল্টা হামলার লক্ষ্যবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
পাবলিকভাবে সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও তুরস্ক ইরানবিরোধী কোনো আক্রমণের বিরোধিতা করেছে। তবে ইসরায়েলি কয়েকটি মিডিয়া বলেছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান হামলার পক্ষে থাকতে পারে—যদিও পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড কোনো সামরিক অভিযানে ব্যবহার করতে দেবে না।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থাকায় একটি বাইরের হামলা ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে ধরা পড়তে পারে। এর ফলাফল হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে—যেমন মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত, বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া। হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়ে থাকে; তাই প্রণালীর ওপর আঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে পূর্বোক্ত সংঘাতে কিছু জটিলতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন প্যাট্রিয়ট ও থাড) পাঠানোর খবর আসে। এসব পদক্ষেপ অঞ্চলীয় উত্তেজনা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি বাড়িয়ে তুলছে।
মিডল ইস্ট আই ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সূত্র উদ্ধৃত করে ঘটনাসংবলিত এই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এখনকার পরিস্থিতি অনিশ্চিত এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দফায় দফায় কূটনৈতিক আলোচনা, আঞ্চলিক সহায়তা ও সামরিক প্রস্তুতি যাচাই করা হচ্ছে। কূটনীতিক ও সামরিক ধরণের যে কোনো পদক্ষেপের ফল regional নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
(সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড—সংগৃহীত প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ)
আজকের খবর/বিএস
