চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ ওয়েবসাইট এশিয়ান মুভি পালসের প্রকাশিত ‘২০২৫ সালের এশিয়ার সেরা ২০ সিনেমা’ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের তিনটি ছবি। তালিকায় পাঁচে জায়গা পেয়েছে মেহেদী হাসানের ‘বালুর নগরীতে’, ১৭ নম্বরে আছে সৌমিত্র দস্তিদারের ‘জুলাই ৩৬: রাষ্ট্র বনাম নাগরিক’ এবং ১৯ নম্বরে নাম এসেছে নুহাশ হুমায়ূনের ‘অ্যানথোলজি ২ষ’—যা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সদ্য উদীয়মান অবস্থাকে প্রতিফলিত করে।
এশিয়ান মুভি পালস ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এ ধরনের তালিকা প্রকাশ করে আসছে। তাদের মতে তালিকাটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে শৈল্পিক গল্পবিন্যাস, অভিনব উপস্থাপনা কৌশল, ভিন্নধর্মী জনরা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এবং উৎসবকেন্দ্রিক আলোচনা—এসবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমকালীন এশীয় সিনেমা দিন দিন আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে। যেসব দেশ একসময় সিনেমায় পিছিয়ে ছিল, তারা এখন শৈল্পিক এবং সাহসী নির্মাণে এগিয়ে আসছে। ইতিহাস, স্মৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মতো বিষয়ের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলনায় বিরল—তাই এই উৎপাদনগুলো বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে সৌদি আরব ও তুরস্ক স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে বৈশ্বিক দর্শকের সংযোগ গড়ে তুলে তাদের নিজস্ব সিনেম্যাটিক ভাষা পরিশুদ্ধ করছে। অন্যদিকে, কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও ইরান এখনও এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্রশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই বছরের তালিকার শীর্ষে আছে জাফর পানাহি পরিচালিত ইরানি সিনেমা ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’—যা গত বছর কান উৎসবে স্বর্ণপাম জয়ের মাধ্যমে ব্যাপক Aufmerksamkeit অর্জন করে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইরাকের ‘ইরকালা: ড্রিমস অব গিলগামেশ’, যেখানে নয় বছর বয়সী এক শিশুর বাবাকে খোঁজার ঘটনা দিয়ে দেশটির সমসাময়িক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় স্থানে আরেকটি ইরানি ছবি ‘কাটিং থ্রো রকস’ এবং চতুর্থ স্থানে সৌদি আরবের রোড মুভি ‘হিজরা’ রয়েছে।
এশিয়ান মুভি পালস ‘বালুর নগরীতে’কে ছোট পরিসরের হলেও দুর্লভ একটি আর্টহাউস রত্ন হিসেবে বর্ণনা করেছে—ছবির ছন্দ মসৃণ, গতিবিধি শান্ত এবং আবহ গভীর। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এমা—যা ভিক্টোরিয়া চাকমা অভিনয় করেছেন—শহরের নানা প্রান্ত থেকে স্কুটারে বালু সংগ্রহ করে বিড়ালের লিটার বক্সের জন্য আনে। একদিন বালু সংগ্রহ করতে গিয়ে এমা এক অপ্রত্যাশিত মোড়ের মুখোমুখি হন; তিনি একটি কাটা আঙুল পান, যা গল্পকে অন্যদিকে টেনে নেয়।
‘বালুর নগরীতে’ গত বছর চেক প্রজাতন্ত্রের কার্লোভি ভারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্বপ্রিমিয়ার হয় এবং সেখান থেকে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার অর্জন করে। এরপর এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং সর্বশেষ গ্লাসগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়েছে।
তালিকার অন্য একটি বাংলাদেশি ছবি ‘জুলাই ৩৬: রাষ্ট্র বনাম নাগরিক’ সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়েছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের দলিল—যা ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করে সাহসী কণ্ঠগুলোকে সামনে আনে। সৌমিত্র দস্তিদার পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৈরি; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তরুণ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে গড়ার জন্য সংগ্রাম করেছে—এসব বাস্তব চিত্রই এতে ফুটে উঠেছে।
নুহাশ হুমায়ূনের ‘অ্যানথোলজি ২ষ’ নিয়ে এশিয়ান মুভি পালসের মন্তব্য—চলচ্চিত্রটি কয়েকটি অসাধারণ গল্পের মাধ্যমে দর্শককে মুগ্ধ করে। কিছু দুর্বলতা থাকলেও এটি একটি প্রশংসনীয় অ্যানথোলজি হিসেবে দেখা হয়েছে।
রিপোর্টের শেষ ভাগে এশিয়ান মুভি পালস স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে এশিয়ার সিনেমার ভিড়ে বাংলাদেশের উত্থানকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নানা ঘরানা ও ফরম্যাটে আত্মবিশ্বাসী পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশি নির্মাতারা ধীরে ধীরে তাদের স্বতন্ত্র সিনেম্যাটিক পরিচয় গড়ছেন—যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আজকের খবর/আতে
