১৮৪৪ সালের ফরাসি উপন্যাস ‘করসিকান ব্রাদার্স’ বহুবার মঞ্চ ও পর্দায় অভিযোজিত হয়েছে। সেই উপন্যাস থেকে ১৯৭১ সালে তামিল ভাষায় নির্মিত হয় একটি ছবি। পরের বছর ১৯৭২-এ তৎকালীন বোম্বেতে সেটি রিমেক হয়ে আসে ‘গোরে অওর কালে’ নামে, যেখানে দ্বৈত চরিত্রের রূপকার ছিলেন রাজেন্দ্র কুমার (মূল তামিল সংস্করণে এমজিআরের মতো বড় তারকাদের অভিনয়ও ছিল)।
আরবসাগরের তীরবর্তী সিনেমা হিট হলে তার ঢেউ আমাদের here এসে পৌঁছায়—শুধু তাই নয়, ঢাকার প্রেক্ষাগৃহগুলোতেও সেই ঢল অনুভূত হয়। তখনকার বক্সঅফিসের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবনে মিজান ঠিক করেন ‘গোরে অওর কালে’ ঢাকার ভাষায় আনা হবে। পুঁজি জোগায় মধুমিতা মুভিজ, আর সামগ্রিক তত্ত্বাবধান করে সিরাজউদ্দিনের বড় ছেলে ফারুক আহমেদ।
গল্প আর প্রযোজনা সব ঠিক থাকল; কিন্তু দুই ভাইয়ের চরিত্রে খেলবে কে—এটাই বড় প্রশ্ন ছিল। এক ভাই কালো-ছায়াসম্পন্ন, সমাজের নিচু তলায় বেড়ে ওঠা; অন্য ভাই সাদাস্বর্ণ, রাজপ্রাসাদের ভেতরে বেড়ে ওঠা—এই দুই বিপরীত রঙ ও ভাবনার চরিত্রের মিলনে কীভাবে একজন অভিনেতা মানিয়ে নেবে, তা নিয়ে producers চিন্তিত ছিলেন।
প্রযোজক ইবনে মিজানের ভাগ্নে জাফর ইকবাল নিজে অভিনয়ের আবেদন জানায়। তাকে স্ক্রিন টেস্ট করানো হলে ‘কালে’ চরিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিকৃত হাঁটা, মুখ থেকে লালা পড়ার মতো কিছুর অভিব্যক্তি পুরোপুরি মেলে না—ফলশ্রুতিতে ইবনে মিজান অনিশ্চয়তায় পড়েন যে জাফরই হবে কি না।
ঠিক তখনই ছবির সেটে হাজির হন জাভেদ—একজন নৃত্যপরিচালক, যার বড় কোনও ছবিতে নাম নেই। ইবনে মিজানের আনুগত্যে যে তিনি এমন দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করবেন, সেটা আশ্চর্যের হলেও বাস্তবে ঘটতে থাকে। জাভেদকে এক সপ্তাহ ধরে সতর্কভাবে সাজানো হয়। তার দেহে কালোর ছোপ, মুখে লেজেন্স দেওয়া হয় যাতে স্বাভাবিকভাবে লালা পড়ে, কানে দুল, বিশেষ উইগ—সব মিলিয়ে তাকে তৈরি করে দেওয়া হয় ‘কালে খাঁ’র রূপে। বেঙ্গল স্টুডিওতে প্রথম দৃশ্যে দাঁড়িয়ে জাভেদ তার অভিব্যক্তি ও শরীরভঙ্গিতে দর্শক ও নির্মাণকর্তাকে হতবাক করে দেন।
মধুমিতা মুভিজের পরিচালক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন—প্রায় ত্রিশ ভাগ শুটিং শেষ হয়েছিল, তবু ইবনে মিজান সন্তুষ্ট ছিলেন না; শেষে ওই শট বাদ দিয়ে জাভেদকে নেওয়া হয়। জাভেদ এমন অভিনয় দেখান যা অনেকের কাছে তাঁর জীবনের সেরা ও চলচ্চিত্র ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য এক কীর্তি বলে মনে করা হয়।
১৯৭৭ সালকে ঢালিউডে ‘সাতাত্তরের সপ্তকাণ্ড’ বলা হয়—সেই বছরে সাতটি সুপারহিট ছবি বাণিজ্যিকভাবে ইন্ডাস্ট্রিটিকে শক্ত অবস্থায় দাঁড় করায়। সেই সাত ছবির একটি ছিল ‘নিশান’—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর ধরেই একচেটিয়াভাবে ব্যবসা করা এই ছবিই জাভেদকে জনসম্মুখে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে। পরবর্তী বছরগুলোতে জাভেদ হয়তো ‘নিশান’-র মতো মারকাট কমার্শিয়াল ছবি পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি, তবু সত্তর ও আশির দশকে ফোক-ফ্যান্টাসি ধারার এক অবিচ্ছেদ্য অভিনেতা হিসেবে তিনি দেশীয় সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন।
ববিতার সঙ্গে তাঁর পর্দার কেমিস্ট্রি ও গান ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’ আজও স্মরণীয়। সত্যিই, একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারের জন্য ডজন ডজন ছবি বাধ্যতামূলক নয়—একটি দুর্দান্ত চরিত্র, একটি কালজয়ী গান ও একটি বড় হিট ছবি মিলেই তাকে জনমনে স্থায়ী করে দেয়।
জাভেদ বা কালে খাঁর মতো একজন শিল্পীর এই যোগদান ও কীর্তিই তাকে যুগে যুগে জনসম্মুখে অম্লান করে রাখে। তাঁর চলে যাওয়ায় আমাদের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্য দিয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবে না। আমরা তাঁর শিল্পীজীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই এবং তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি।
